ভূমিকা: বাংলা নববর্ষ আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। এই ব্লগে আমরা বাংলা নববর্ষ উদযাপন সম্পর্কে সুন্দর একটি রচনা নিয়ে এসেছি। আশা করি, এই রচনাটি তোমার কাজে আসবে। পুরো রচনাটি পড়ো এবং বাংলা নববর্ষ সম্পর্কে আরো ভালোভাবে জানো!
বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন রচনা
ভূমিকা :
‘হে নূতন, এসো তুমি সম্পূর্ণ গগন পূর্ণ করি
পুঞ্জ পুঞ্জ রূপে’ -রবীন্দ্রনাথ
দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, মাসের পর মাস গড়িয়ে আসে পহেলা বৈশাখ। চৈত্র অবসানে বর্ষ হল শেষ। এল নতুন বছর। নববর্ষ। পৃথিবীর সর্বত্রই নববর্ষ একটি ‘ট্র্যাডিশন’ বা প্রচলিত সংস্কৃতিধারা। আদিকাল থেকেই যে কোনো বছরের প্রথম দিনই ‘নববর্ষ’ নামে পরিচিত হয়ে আসছে। ‘পুরাতন বছরের জীর্ণ ক্লান্ত রাত্রি’-র অন্তিম প্রহর হল ঘোষিত। তিমির রাত্রি ভেদ করে পূর্বদিগন্তে উদিত হল নতুন দিনের জ্যোতির্ময় সূর্য। প্রকৃতির নিসর্গ মঞ্চে ধ্বনিত হল নব-জীবনের সঙ্গীত। আকাশ সাজল অপরূপ সাজে। পত্রে পত্রে তার পুলক-শিহরণ। গাছে গাছে তার আনন্দ-উচ্ছ্বাস। পাখির কণ্ঠে কণ্ঠে নব প্রভাতের বন্দনা-গীতি। দিকে দিকে মানুষের বর্ষ-বরণের উৎসব-আয়োজন। অভিনন্দন-শঙ্খধ্বনিতে হয় নতুনের অভিষেক। রাত্রির তপস্যা শেষে এই শুভদিনের উদার অভ্যুদয়ে মানুষের হৃদয়ে-উৎসারিত কলোচ্ছ্বাসে ভরে গেল পৃথিবী। নতুন দিনের কাছে আমাদের অনেক প্রত্যাশা, প্রার্থনা দুঃখ জয়ের।
পহেলা বৈশাখ : পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন। এ দিনটি বাংলাদেশে ও পশ্চিমবঙ্গে নববর্ষ হিসেবে পালিত হয়। এটি বাঙালির একটি সর্বজনীন লোকউৎসব। এদিন আনন্দঘন পরিবেশে বরণ করে নেওয়া হয় নতুন বছরকে। কল্যাণ ও নতুন জীবনের প্রতীক হল নববর্ষ। অতীতের ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন করে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় উদ্যাপিত হয় নববর্ষ। বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা হয় মূলত আকবরের সময় থেকেই। তারপর থেকে মোগলরা জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়া পর্যন্ত পহেলা বৈশাখ পালন করতেন।
নববর্ষের আশ্বাস : নববর্ষের দিনটি এক ধরনের অদ্ভুত মাধুর্য এবং উজ্জীবিত অনুভূতির সৃষ্টি করে, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নিত্যতা থেকে এক ভিন্ন অনুভূতি উপহার দেয়। যদিও এই দিনটি অন্য যে কোনো দিনের মতোই শুরু হয়—সূর্যোদয়, পাখির গান, প্রকৃতির সুন্দর রূপ—তবুও এটি অন্য দিনের চেয়ে বিশেষ। বছরের প্রথম দিন হিসেবে এটি আমাদের কাছে একটি নতুন শুরু, নতুন আশা এবং নতুন স্বপ্ন নিয়ে আসে। একদিকে এটি আমাদের পূর্বের বছরের কঠিন মুহূর্তগুলো ভুলে গিয়ে নতুনভাবে জীবন শুরু করার সুযোগ দেয়, অন্যদিকে এটি আমাদের চিত্তের জীর্ণতা এবং হতাশা থেকে মুক্তির বার্তা বয়ে আনে। এই দিনটি আমাদের মনে নতুন শক্তি এবং অনুপ্রেরণা জাগিয়ে তোলে, যেন প্রতিটি মুহূর্ত নতুন করে উপভোগ করার এক অসীম সম্ভাবনা খুলে যায়।
বর্ষারম্ভের পুণ্য-মুহূর্তে নবোদিত সূর্যের আলোকের ঝরণা ধারায় আমরা শুচিস্নাত হয়ে অনুভব করি পরম প্রেমময়ের আনন্দ-স্পর্শ। আমাদের স্বার্থপরতা, ক্ষুদ্রতার নির্মোক ভেঙে আমরা সেদিন মিলনের উদার উৎসব-প্রাঙ্গণে এসে সম্মিলিত হই। আমাদের হৃদয় আজ কোন্ অসীমের রাজ্যে, কোন্ অনির্বচনীয় আনন্দের অভিমুখে ধেয়ে চলেছে। নববর্ষের পুণ্য-প্রভাতে আমাদের নিজেদের মধ্যে সর্বজয়ী মানবশক্তি উপলব্ধি করার দিন। মানুষের জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে গেল সুখ-দুঃখে গড়া একটি বছর। কিন্তু তার জন্য শোক নয়- যা এলো, যা অনাগত সম্ভাবনায় সমুজ্জ্বল, তাকে আবাহন করার দিন আজ।
বাংলাদেশে নববর্ষ উদ্যাপনের বৈশিষ্ট্য : পয়লা বৈশাখ বাংলার জনসমষ্টি অতীতের সুখ-দুঃখ ভুলে গিয়ে নতুনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ওঠে। জানে এ নতুন অনিশ্চিতের সুনিশ্চিত সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ। তাই মন সাড়া দেয়, চঞ্চল হয়। নতুনকে গ্রহণ করার প্রস্তুতি নেয়। আর সে দিন প্রাত্যহিক কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে ঘরবাড়ি ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে। আটপৌরে জামা কাপড় ছেড়ে ধোপদুরস্ত পোশাক-পরিচ্ছদ পরে, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখা করে পানাহারে মেতে ওঠে। রমনার বটের তলায় জড়ো হয়ে গান গাই, হাততালি দিই। সবকিছু মিলে দেশটা যেন হয়ে ওঠে উৎসবে আনন্দে পরিপূর্ণ। এছাড়াও এদেশের স্থানীয় কতগুলো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাংলা নববর্ষের বৈশিষ্ট্যসমূহ ফুটে ওঠে। যেমন : ‘মেঘের কাছে জল ভিক্ষা করা’, ‘বার্ষিক মেলা’, ‘পুণ্যাহ’, ‘হালখাতা’ ইত্যাদি।
নববর্ষ উদ্যাপনে গ্রামীণজীবন ও নগরজীবন : নববর্ষের উৎসব গ্রামীণ জীবনে এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে, যা শহরের তুলনায় অনেক বেশি প্রাণবন্ত এবং এককথায় অপরূপ। গ্রামের সাধারণ মানুষদের কাছে নববর্ষ একটি নতুন আশা এবং প্রথাগত আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। এই দিনটিতে পল্লী অঞ্চলে মেলা বসে, যেখানে মেলা উপলক্ষে বিচিত্র আনন্দ-অনুষ্ঠান, কেনাবেচার বাণিজ্যিক লেনদেন, এবং মানুষের মধ্যে এক অবিনাশী সুখ-দুঃখের ভাগাভাগি দেখা যায়। মেলার আনন্দের মাঝে সব বয়সী মানুষ তাদের আন্তরিকতায় ভরপুর হয়ে ওঠে, একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয় এবং এক নতুন দিনের শুরুর আনন্দে মেতে ওঠে। নববর্ষের এই দিনেই ব্যবসায়ীরা তাদের হালখাতা আয়োজন করে, যেখানে তারা তাদের পুরনো হিসাব মিলিয়ে নতুন করে শুরু করে এবং ক্রেতাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করে, যেন সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। এর সঙ্গে যোগ হয় দরিদ্রদের ভোজন, নৃত্য-গীত, এবং আনন্দঘন উৎসব, যা বছরের প্রথম দিনটিকে আরও বিশেষ করে তোলে। গৃহস্থরাও নানা পুণ্য কাজে এই দিনটি স্মরণীয় করে রাখার চেষ্টা করে, এবং গ্রামের নানা প্রান্তে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও উৎসব মঞ্চ গড়ে ওঠে, যা নববর্ষের মধুরতা এবং ঐক্যকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
বৈশাখী মেলা : নববর্ষকে উৎসবমুখর করে তোলে বৈশাখী মেলা। এটি মূলত সর্বজনীন লোকজ মেলা। এ মেলা অত্যন্ত আনন্দঘন হয়ে থাকে। স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য কারুপণ্য, লোকশিল্পজাত পণ্য, কুটির শিল্পজাত সামগ্রী, সকলপ্রকার হস্তশিল্পজাত ও মৃৎশিল্পজাত সামগ্রী এই মেলায় পাওয়া যায়। এছাড়া শিশু-কিশোরদের খেলনা, মহিলাদের সাজ-সজ্জার বৈচিত্র্যময় সমারোহ থাকে। মেলায় বিনোদনেরও ব্যবস্থা থাকে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকগায়ক ও লোকনর্তকদের উপস্থিতি থাকে। তাঁরা যাত্রা, পালাগান, কবিগান, জারিগান, গম্ভীরা গান, গাজীর গানসহ বিভিন্ন ধরনের লোকসঙ্গীত, বাউল-মারফতি-মুর্শিদি-ভাটিয়ালি ইত্যাদি বিভিন্ন আঞ্চলিক গান পরিবেশন করেন। লাইলী-মজনু, ইউসুফ-জোলেখা, রাধা-কৃষ্ণ প্রভৃতি আখ্যানও উপস্থাপিত হয়। চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, নাটক, পুতুলনাচ, নাগরদোলা, সার্কাস ইত্যাদি মেলার বিশেষ আকর্ষণ। এছাড়া শিশু-কিশোরদের আকর্ষণের জন্য থাকে বায়োস্কোপ। শহরাঞ্চলে নগর সংস্কৃতির আমেজে এখনও বৈশাখী মেলা বসে এবং এই মেলা বাঙালিদের কাছে এক আনাবিল মিলন মেলায় পরিণত হয়। বৈশাখী মেলা বাঙালির আনন্দঘন লোকায়ত সংস্কৃতির ধারক।
নগরজীবনে নববর্ষ উদ্যাপন : বর্তমানে নগরজীবনে নগর-সংস্কৃতির আদলে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে নববর্ষ উদ্যাপিত হয়। পয়লা বৈশাখের প্রভাতে উদীয়মান সূর্যকে স্বাগত জানানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় নববর্ষের উৎসব। এ সময় নতুন সূর্যকে প্রত্যক্ষ করতে উদ্যানের কোনো বৃহৎ বৃক্ষমূলে বা লেকের ধারে অতি প্রত্যুষে নগরবাসীরা সমবেত হয়ে নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে শিল্পীরা সঙ্গীত পরিবেশন করেন। এদিন সাধারণত সকল শ্রেণীর এবং সকল বয়সের মানুষ ঐতিহ্যবাহী বাঙালি পোশাক পরিধান করে। নববর্ষকে স্বাগত জানাতে তরুণীরা লালপেড়ে সাদা শাড়ি, হাতে চুড়ি, খোপায় ফুল, গলায় ফুলের মালা এবং কপালে টিপ পরে; আর ছেলেরা পরে পাজামা ও পাঞ্জাবি। কেউ কেউ ধুতি-পাঞ্জাবিও পরে। এদিন সকালবেলা পানতা ভাত খাওয়া একটি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। সঙ্গে থাকে ইলিশ মাছ ভাজা। এভাবে লোকজ বর্ষবরণ প্রথাগুলোর কোনো কোনোটির অনুসরণের মাধ্যমে গ্রামীণ ঐতিহ্য অনেকটা সংরক্ষিত হচ্ছে।
রাজধানী ঢাকার বর্ষবরণ আয়োজন : বর্ষবরণের চমকপ্রদ ও জমজমাট আয়োজন ঘটে রাজধানী ঢাকায়। এখানে বৈশাখী উৎসবের অনুষ্ঠানমালা এক মিলনমেলায় পরিণত হয়। নববর্ষের প্রথম প্রভাতে রমনা উদ্যান ও এর চারপাশের এলাকায় উচ্ছ্বল জনস্রোতে সৃষ্টি হয় জাতীয় বন্ধন। ছায়ানটের উদ্যোগে জনকীর্ণ রমনার বটমূলে রবীন্দ্রনাথের আগমনী গান
‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’
-এর মাধ্যমে নতুন বর্ষকে বরণ করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের বকুলতলার প্রভাতী অনুষ্ঠানেও নববর্ষকে স্বাগত জানানো হয়। এখানকার চারুশিল্পীদের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা নববর্ষের আহ্বানকে করে তোলে নয়ন-মনোহর। এ শোভাযাত্রা উপভোগ করে সকল শ্রেণীর আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা। এদিন শহীদ মিনার প্রাঙ্গন, টি.এস.সি. এবং চারুকলাসহ সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা পরিণত হয় এক বিশাল জনসমুদ্রে।
জাতীয় কর্মসূচি ও নববর্ষ পালন : বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষে বাংলা একাডেমী, নজরুল ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী, জাতীয় জাদুঘর, ছায়ানট, বুলবুল ললিতকলা একাডেমী, নজরুল একাডেমী, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান এবং দেশের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে।
বাংলা নববর্ষ ও উপজাতি সম্প্রদায় : বাংলা নববর্ষ ও চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে তিন পার্বত্য জেলায় (রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি) উপজাতীয়দের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয়-সামাজিক উৎসব ‘বৈসাবি’ আনন্দমুখর পরিবেশে পালিত হয়। এটি পাহাড়িদের সবচেয়ে বড় উৎসব। এ উৎসবকে চাকমারা ‘বিজু’, মারমারা ‘সাংগ্রাই’ এবং ত্রিপুরারা ‘বৈসুক’ বলে আখ্যা দিলেও গোটা পার্বত্য এলাকায় তা ‘বৈসাবি’ নামে পরিচিত।
নববর্ষের গুরুত্ব ও তাৎপর্য : আমাদের জীবনেতিহাসের সার্বিক পটভূমিতে এ দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। আমাদের জাতীয় চেতনা অর্থাৎ বাঙালি সত্তার সঙ্গে পহেলা বৈশাখের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। বাঙালি সমাজ-সংস্কৃতির অস্থিমজ্জার সঙ্গে একাকার হয়ে আছে বাংলা নববর্ষের মাহাত্ম্য। রূপকথার জিয়ন কাঠির মতো এ দিনটির মর্মস্পর্শে দূরীভূত হয় পুরোনো দিনের সকল জরাজীর্ণতা। নতুনের ছোঁয়ায় রঙিন হয়ে উঠে বাঙালির ক্লান্ত-শ্রান্ত জীবন। প্রতিবছর এ দিনটি হয়ে উঠে উৎসবমুখর। বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুজাতি-গোষ্ঠী অধ্যুষিত একটি শান্তির দেশ। এখানে প্রতিটি সম্প্রদায়ের রয়েছে নিজস্ব ধর্মীয় উৎসব। এগুলোর অধিকাংশই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আনন্দ অনুষঙ্গ বলে স্বীকৃত, কিন্তু পহেলা বৈশাখই একমাত্র উৎসব যা কোনো ধর্মের বা গোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি গোটা জাতির তথা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অখণ্ড বাঙালি জাতির উৎসব। পহেলা বৈশাখের অনুষঙ্গে দেশের সকল মানুষ একই সময় অভিন্ন আনন্দ-অনুভূতিতে উদ্বেলিত হয়ে পড়ে। তারা নিজেদের মনে করে এক অখণ্ড সত্তা রূপে। ফলে জাতিগত সংহতি ও ঐক্য সুদৃঢ় হয়ে মানুষে মানুষে, ধর্মে ধর্মে, বর্ণে বর্ণে দূরত্ব কমে আসে। নববর্ষ পরিণত হয় একটি সার্বজনীন অনুষ্ঠানে।
দিন বদলের পালায় নববর্ষ : আজ উৎসবের অঙ্গে যুগ-পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট। উৎসবে যেখানে একদা হৃদয়-আবেগের প্রাধান্য ছিল, ছিল প্রীতিময় আন্তরিকতা, আজ কৃত্রিমতা তাকে গ্রাস করেছে। সেখানে হৃদয়হীন আচার-অনুষ্ঠানের মাতামাতি। চোখ-ঝলসানো চাকচিক্য আজ উৎসবের বৈশিষ্ট্য। নাগরিক সভ্যতার যান্ত্রিকতা আজ আমাদের হৃদয়-ঐশ্বর্য লুণ্ঠন করেছে। নির্বাসিত করেছে শুষ্ক, নিষ্প্রাণ জড়জগতে। উৎসবে তাই আজ আমাদের হৃদয়-দৈন্যের নগ্নতা। উৎসবের মহতী কল্যাণী রূপটি তাই আজ আমাদের কাছে অনুদ্ভাসিত। নববর্ষের উৎসব-অনুষ্ঠানেও আজ আন্তরিক প্রীতির অনেক অভাব। মাইকে চটুল গানের বাড়াবাড়ি। সেখানেও উল্লাস মত্ততার চিত্র। সেখানে আমাদের হৃদয়-সংকুচিত, আমাদের দ্বার রুদ্ধ। বর্ষবরণ উৎসবেও ‘দীপালোকের উজ্জ্বলতা, খাদ্য-প্রাচুর্য, আয়োজন-বৈচিত্র্য।’ সেখানে আমাদের শুষ্কতা, আমাদের দীনতা, আমাদের নির্লজ্জ কৃপণতারই প্রকাশ। তাই আজ এই সর্ব-বন্দনার পূর্ণ্য-মুহূর্তে আমাদের মনে রাখতে হবে, ‘সমারোহ সহকারে আমোদ প্রমোদ করায় আমাদের উৎসব কলা কিছুমাত্র চরিতার্থ হয় না। তাহার মধ্যে সর্বদলের আন্তরিক প্রসন্নতা ও ইচ্ছাটুকু না থাকিলেই নয়।’ নববর্ষে যেন ফিরে পাই আমাদের সেই হৃত-গৌরব। আবার যেন আমাদের হৃদয় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে আন্তরিক প্রসন্নতা ও কল্যাণী ইচ্ছার ভাবরসে। আবার যেন আমরা বর্ষারম্ভের উৎসবে খুঁজে পাই ‘মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব’ করার মহত্ত্ব। আজ নববর্ষ উৎসব ‘সত্যের গৌরবে, প্রেমের গৌরবে, মঙ্গলের গৌরবের, কঠিন বীর্য, নির্ভীক মহত্বের গৌরবে’ উদ্ভাসিত হয়ে উঠুক।
উপসংহার : নববর্ষ সমগ্র মানুষের কাছে নবজীবনের দ্বার উন্মোচিত করে দিক। নতুন বছর যেন মুষ্টিমেয় ধনীর ভোগবিলাসের সঙ্কীর্ণ উল্লাসে পরিণত না হয়’ দারিদ্র্য লাঞ্ছিত পীড়িত মানুষের নিষ্ফল বিলাপে যেন পৃথিবী বিষণ্ণ না হয়ে ওঠে; যুদ্ধদীর্ণ বিশ্বের পাশবশক্তির তাণ্ডব যেন শান্তির শুভশক্তির কাছে পরাভূত হয়। আসুন পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে আমরা আমাদের মধ্যকার সকল বিভেদ ও দ্বিধা দূর করতে সচেষ্ট হই। আমরা জাগ্রত হই অখণ্ড জাতীয় চেতনায়। আমরা ঋদ্ধ হই আগামীর গর্বিত প্রেরণায়। নতুন বছর আমাদের সবাই জীবনে সুখ-সম্ভার বয়ে আনুক এটাই হউক আমাদের প্রত্যাশা। আজ নববর্ষের এই শুভক্ষণে, আসুন, কবিকণ্ঠে মিলিয়ে আমরা বলি,
‘যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ,
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাবো জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি-
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
(একই রচনা আরেকটি বই থেকে সংগ্রহ করে দেয়া হলো)
বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন রচনা ২
ভূমিকা : পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিন আমাদের জাতীয় জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎসব, যা আমাদের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির গভীরে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। নববর্ষের দিনটি শুধু একটি সময়ের পরিবর্তন নয়, বরং এটি নতুন আশা, নতুন সম্ভাবনা এবং এক নতুন শুরু করার উপলক্ষ। পুরনো বছরের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা থেকে মুক্ত হয়ে, নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে মানুষ একত্রিত হয় এবং তারা মনে করে যে, ভবিষ্যতের পথই তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। বাংলাদেশের মানুষের কাছে পহেলা বৈশাখ একটি জাতির মিলনমেলা, যেখানে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ একত্রিত হয়ে, একে অপরের সাথে আনন্দ ভাগ করে নেয়। এদিন হাট, মাঠ, ঘাট, শহর বা গ্রাম—সবখানেই এক উল্লাসের পরিবেশ থাকে। বৈশাখী মেলার আয়োজন, রঙ্গিন পোশাক, মুখরিত গানের সুর, খাবারের সামগ্রী এবং মিষ্টি-বাণিজ্যের মধ্যে সবার মধ্যে এক আনন্দ ও শান্তির আভা ছড়িয়ে পড়ে। এই দিনে পুরনো বছরের বেদনা ভুলে সবাই নতুন স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যায়। এটি শুধু একটি দিন নয়, এটি আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধার প্রতীক।
বাংলা নববর্ষের উদ্ভব : এ উপমহাদেশে মুসলিম শাসকগণ সর্বপ্রথম হিজরি সন প্রবর্তন করেন। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজী বঙ্গরাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন ৬০০ হিজরি মোতাবিক ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে। তখন থেকে শুরু করে উপমহাদেশে সম্রাট আকবরের রাজত্বকালেও চন্দ্র বর্ষভিত্তিক হিজরি সন প্রচলিত ছিল। সরকারি কাজেও হিজরি সন ব্যবহার করা হতো। হিজরি সন চন্দ্র সন বলে এ সনের বছর ছিল কিছু কম অর্থাৎ ৩৫৪ দিন। অন্যদিকে সৌরসনের বছর ৩৬৫ দিনে হওয়ায় প্রতি বছর চন্দ্র সনের সাথে ১০/১১ দিনের পার্থক্য হয়ে যেত। এর ফলে প্রতি বছরে দিনক্ষণ ও তিথি নক্ষত্র, লগ্নভিত্তিক উৎসব, আচার-আচরণ, উৎসব অনুষ্ঠানে দারুণ অসুবিধা দেখা দেয়। এ ছাড়াও চন্দ্র বর্ষের হিসেবে একই মৌসুমে একই মাস বিদ্যমান থাকে না বিধায় উপমহাদেশে রাজকোষের খেরাজ বা খাজনা আদায়ের ব্যাপারে অসুবিধায় পড়তে হয়। সাধারণত কৃষকেরা প্রধান ফসল যখন তোলেন তখন খাজনা আদায় সুবিধাজনক। কেননা ফসল মওসুম ঋতুভিত্তিক আর হিজরি সন চান্দ্রভিত্তিক। কিন্তু চান্দ্র বর্ষে মাস এগিয়ে যায় বলে তহসীলদাররা এবং প্রজারা উভয়ই অসুবিধায় সম্মুখীন হন। এ সকল অসুবিধার কথা সম্রাট আকবরের দরবারে নবরত্ন ও অন্যান্য সভাসদদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়।
সভাসদদের আলোচনার ভিত্তিতে মুঘল সম্রাট আকবর সৌর মাসভিত্তিক বর্ষ গণনার কথা চিন্তা করেন। তার রাজত্বের ২৯ বছরের সময় তিনি তার দরবারের অন্যতম পণ্ডিত জ্যোতিষ শাস্ত্রবিদ আমীর ফতেহ উল্লাহ সিরাজীকে হিজরি সনের সাথে সমন্বয় করে সৌরবর্ষভিত্তিক ‘ফসলি সন’ প্রবর্তনের নির্দেশ দেন। তিনি সম্রাটের নির্দেশ মোতাবিক সৌর মাসভিত্তিক একটি নতুন সনের উদ্ভাবন করেন। এটি মৌসুম ভিত্তিক সৌরসন। এর নাম দেয়া হয় ‘ফসলি সন’। সম্রাট আকবর ৯৯৩ হিজরি সন মোতাবেক ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ মতান্তরে ১১ মার্চ ‘ফসলি সন’-এর ফরমান জারি করেন। পরবর্তীকালে এ ফসলি সনই বাংলা সন বা বঙ্গাব্দে নামান্তরিত হয়।
পহেলা বৈশাখ : বাংলার সর্বজনীন উৎসব : যদিও বাংলাদেশকে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মত ইংরেজি বর্ষের দিনক্ষণ মেনে চলতে হয় তবুও বাঙালির ঐতিহ্যের শেকড়ে প্রথিত বাংলা নববর্ষের গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলা নববর্ষই আমাদের একমাত্র সাংস্কৃতিক সর্বজনীন উৎসব। জাতিগত দিক থেকে এ দেশের মুসলমানরা ঈদ, হিন্দুরা দুর্গোৎসব, বৌদ্ধরা বৌদ্ধ পূর্ণিমা এবং খ্রিস্টানরা বড় দিনের উৎসব পালন করে থাকেন। এগুলো ধর্মীয় চেতনায় উদ্ভূত উৎসব। কিন্তু বাঙালি জাতির সম্মিলিত উৎসব একটিই। তাহলো নববর্ষের এ বৈশাখী উৎসব।
বাংলা নববর্ষ বহুমাত্রিকতায় পরিপূর্ণ। আমাদের প্রকৃতি ও সমাজ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, আমাদের জীবনাচার সবকিছুর সঙ্গেই নববর্ষের যোগ। আগে নববর্ষের উৎসব অনুষ্ঠান পল্লীকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু এখন তা শহরে ব্যাপ্ত হয়ে জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। পহেলা বৈশাখ নতুনতর চেতনা ও উপলব্ধি নিয়ে বাঙালির সাংস্কৃতিক চৈতন্যে পল্লব বিস্তার করছে। ব্যক্তির কাছে ব্যক্তিকে, ব্যষ্টির কাছে সমষ্টিকে এনে মেলবন্ধন রচনা করছে। আর তাই কম্পিউটার, ইন্টারনেট, ই-মেইলের আধুনিক যুগেও আমাদের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় পহেলা বৈশাখে সাড়ম্বরে শুভ হালখাতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। দোকানপাঠ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বসে আনন্দের ঢল। মিষ্টি মুখের মাধ্যমে খোলা হয় নতুন বছরের হালখাতা। হাটে-বাজারে, খোলামাঠে, দর্শনীয় এলাকায় বসে বৈশাখী মেলা। মৌসুমী ফলমূল, নানারকম কুটির শিল্পজাতদ্রব্য, মাটি, কাঠ, বাঁশ, বেতের তৈরি প্রয়োজনীয় জিনিস ও খেলনা যেমন হাতি, ঘোড়া, গাড়ি, ঢাক-ঢোল, ভেঁপু, মুখোশ, মুড়ি-মুড়কি, বাতাসা কেনার ধুম পড়ে যায়। নাগরদোলা, পুতুল নাচের আসরে আনন্দ উপভোগ করে কেউ কেউ। ঢাকায় রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে নামে জনতার ঢাল। চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রায় বাঙালির আপন ঐতিহ্য আলোয় আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। আর এভাবেই পহেলা বৈশাখ পরিণত হয় বাংলার সর্বজনীন লোক উৎসবে।
নববর্ষের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য : বাংলা নববর্ষ আমাদের জাতিসত্তার পরিচয়কে বহন করে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নববর্ষ আজ আমাদের জাতীয় উৎসব। আমাদের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে আমরা প্রত্যক্ষ করি নববর্ষের অনুষ্ঠানে, আবিষ্কারও করি এ উৎসবে। নববর্ষের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আমরা আমাদের জীবনবাদী ও কল্যাণধর্মী রূপটিকেই খুঁজে পাই। নতুন বর্ষকে স্বাগত জানানো মানে আমাদের জীবনকেই নতুনভাবে গ্রহণের, সাজানোর প্রস্তুতি। আমাদের নববর্ষের উৎসব নির্মল আনন্দের উৎসধারা। এখানে আনন্দের বিস্তার আছে, তা কখনো পরিমিতিবোধকে ছাড়িয়ে যায় না। বিদেশে নিউ ইয়ার্স ডে-তে যে উদ্দামতা প্রত্যক্ষ করা যায় তাতে প্রতি বছর বহু প্রাণের অকাল মৃত্যু ঘটে। আনন্দের আয়োজন বিষাদের ক্রন্দনে বিধুর হয়ে ওঠে। কিন্তু আমাদের দেশে আমরা বাংলা নববর্ষকে বরণ করি প্রভাতী অরুণালোকে-প্রকৃতির উন্মুক্ত পরিবেশে নির্মল আনন্দ আয়োজনের মাধ্যমে।
নববর্ষ ও বৈশাখী মেলা : বৈশাখী মেলা সম্ভবত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সর্বজনীন মিলনোৎসব। নববর্ষকে উৎসবমুখর করে তোলে বৈশাখী মেলা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের এক মহামিলন ক্ষেত্র এই মেলা। ‘মেলা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ প্রাচুর্য, আমাদের কুটির শিল্পজাত এমন কোনো পণ্য নেই যা বৈশাখী মেলায় দৃষ্টিগোচর হয় না। প্রচুর সামগ্রীর এমন বিপুল সমাবেশ হয় বলেই এর নাম ‘মেলা’। বৈশাখী মেলা অত্যন্ত আনন্দঘন হয়ে থাকে। স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য, কারুপণ্য, লোকশিল্পজাত পণ্য, কুটির শিল্পজাত সামগ্রী ও সকল প্রকার হস্তশিল্পজাত এবং মৃৎশিল্পজাত সামগ্রী এ মেলায় পাওয়া যায়। এছাড়া শিশু-কিশোরদের খেলনা, মহিলাদের সাজ-সজ্জার সামগ্রী এবং বিভিন্ন লোকজ খাদ্যদ্রব্য যেমন : চিড়া, মুড়ি, খৈ, বাতাসা ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার মিষ্টি প্রভৃতির বৈচিত্রময় সমারোহ থাকে বৈশাখী মেলায়।
বাংলা নববর্ষে উপজাতীয় উৎসব : বাংলা নববর্ষ ও চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে তিন পার্বত্য জেলায় (রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি) উপজাতীয়দের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয়-সামাজিক উৎসব ‘বৈসাবি’ আনন্দমুখর পরিবেশে পালিত হয়। বৈসাবি হলো পাহাড়িদের সবচেয়ে বড় উৎসব। এ উৎসবকে চাকমারা বিজু, মারমারা সাংগ্রাই এবং ত্রিপুরারা বৈসুক বলে আখ্যা দিলেও গোটা পার্বত্য এলাকায় তা বৈসাবি নামেই পরিচিত। বৈসুক, সাংগ্রাই ও বিজু এ নামগুলোর আদ্যক্ষর নিয়ে বৈসাবি শব্দের উৎপত্তি। বছরের শেষ দু’দিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিন এ তিনদিন মিলেই মূলত বর্ষবরণ উৎসব ‘বৈসাবি’ পালিত হয়।
পাহাড়িরা তিন দিনব্যাপী এ বর্ষবরণ উৎসব সেই আদিকাল থেকে পালন করে আসছে। এ উৎসব উপলক্ষে পাহাড়িদের বিভিন্ন খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আদিবাসী মেলার আয়োজন করা হয়। নববর্ষের দিন মারমা উপজাতীরা আয়োজন করে ঐতিহ্যবাহী ওয়াটার ফেস্টিবল বা পানি খেলা। পানিকে পবিত্রতার প্রতীক ধরে নিয়ে মারমারা তরুণ-তরুণীদের পানি ছিটিয়ে পবিত্র ও শুদ্ধ করে নেয়। পাহাড়িদের মধ্যে পানি উৎসবটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িরা বৈসাবি উৎসবকে তিনটি ভাগে পালন করে। প্রথম দিনটির নাম ফুল বিজু। এ দিন শিশু-কিশোররা ফুল তুলে ঘর সাজায়। দ্বিতীয় দিনটি হচ্ছে মুরুবিজু। এ দিনে হয় মূল অনুষ্ঠান। এ দিন নানারকম সব্জির সমন্বয়ে এক ধরনের নিরামিষ রান্না করা হয়, যার নাম পাজন। এটি বৈসাবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের পিঠা ও মিষ্টান্নও তৈরি করা হয়। অতিথিদের জন্য এদিন সবার ঘরের দরজা খোলা থাকে। বলা যায়, এ পালা পার্বণকে কেন্দ্র করেই বাঙালি সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের মনের উদারতা প্রশস্ত হয়, অটুট বন্ধনে আবদ্ধ হয় বাঙ্গালিত্বের বন্ধন।
উপসংহার : বাঙালি সংস্কৃতির অঙ্গ হিসেবে পহেলা বৈশাখ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন, যা শুধু সময়ের পালাবদল নয়, বরং আমাদের জাতিগত গর্ব ও ঐতিহ্যের পূর্ণতা। বাংলা নববর্ষের মাধ্যমে আমাদের অতীত ইতিহাসকে পুনরায় স্মরণ করা হয়, বর্তমানকে মূল্যায়ন করা হয়, এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এই দিনটি আমাদের জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা, যেখানে পুরনো বেদনা ও দুঃখকে ত্যাগ করে, আমরা নতুন সম্ভাবনা ও আশায় ভরপুর এক নতুন পথের দিকে এগিয়ে যাই।
বাংলা নববর্ষ শুধুমাত্র একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়, বরং এটি আমাদের জাতিগত ঐক্য, সম্মিলন এবং সাংস্কৃতিক গৌরবের প্রতীক। সারা দেশে একসাথে উদযাপন করা হয় এই দিনটি, যা আমাদের ঐতিহ্যকে স্মরণ করে এবং একে অপরের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান এবং আন্তরিকতা বাড়িয়ে তোলে। বিভিন্ন আনন্দ অনুষ্ঠান, মেলা, উৎসবের মধ্য দিয়ে দেশের সর্বত্র এক অভিন্ন আনন্দের বাতাবরণ সৃষ্টি হয়, যা একে অপরকে আরও কাছে নিয়ে আসে। এই দিনে বাঙালি নতুন করে তার পরিচয় ও সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যায়, এবং নিজের ঐতিহ্যের সঙ্গে একাত্ম হয়ে নতুন জীবনযাত্রার শুরু করে।
এছাড়াও, নববর্ষের দিনটি আমাদের একক দেশ হিসেবে জাতীয় ঐক্য ও সাংস্কৃতিক দিক নির্দেশনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব।
এই ছিল বাংলা নববর্ষ উদযাপন সম্পর্কে একটি সুন্দর রচনা। যদি তুমি আরও রচনা পড়তে চাও, তাহলে StudyTika.com এ ভিজিট করো। এখানে তুমি আরও অনেক ভালো ভালো রচনা পাবে!