ভূমিকা: জন্ম যেখানেই হোক, আমাদের কাজ যেন সবসময় ভালো হয়—এই কথাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই ব্লগপোস্টে "জন্ম হোক যথা তথা, কর্ম হোক ভাল" নিয়ে একটি সুন্দর ও শিক্ষামূলক রচনা রয়েছে। এটি পড়লে আপনি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাবেন। চলুন, রচনাটি পড়া শুরু করি!
জন্ম হোক যথা তথা, কর্ম হোক ভাল রচনা
ভূমিকা : কর্মই জীবন। কর্মমুখর জীবনের সফলতাই মানুষকে যথার্থ মর্যাদার অধিকারী করে। একজন কবি মানবজীবনের কর্মফলের গুরুত্ব বিবেচনা করে লিখেছেন,
বুনিয়াদি বটবৃক্ষ, কত নাম তার,
অখাদ্য তাহার ফল, কাকের আহার।
আপনার কথাগুলো অত্যন্ত সঠিক। মানবজীবনের প্রকৃত সফলতা তার কাজের মধ্যেই নিহিত থাকে। যে কাজ মানুষের সমাজের জন্য উপকারী, যে কাজ অন্যদের উন্নতির দিকে প্রেরণা দেয়, তারই মূল্য রয়েছে। বংশগৌরব বা অভিজাত্যের ভিত্তিতে কোনো মানুষের মর্যাদা মূল্যায়ন করা অর্থহীন, কারণ প্রকৃত পরিচয় তার কর্মকাণ্ড ও অবদান দ্বারা ফুটে ওঠে।
একজন মানুষ যতটা নিজের আত্মপরিচয় তৈরি করে তার কাজের মাধ্যমে, ততটাই তার মর্যাদা এবং তার জীবনের সফলতা প্রস্ফুটিত হয়। কাজের মধ্য দিয়ে একজন ব্যক্তি সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, নিজের কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে পারে এবং তার সাফল্যের প্রমাণ পাওয়া যায়। জীবন থেকে সর্বোচ্চ ফল লাভের জন্য আমাদের কাজের প্রতি আস্থা রাখতে হবে এবং নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে হবে।
মর্যাদার ধারণা : আমাদের সমাজে নানা ধরনের লোক বস করে। সমাজের মধ্যে ধনী লোক আছে, আবার গরিব লোকও আছে, ভাল মানুষও আছে, আবার মন্দ লোকেরও অভাব নেই। সংসারের এই বিচিত্র মানুষের সত্যিকার পরিচয় সন্ধান করলে তার কাজের মধ্যে যেমন আসল পরিচয় পাওয়া যাবে তেমন পরিচয় অন্য কোন দিক থেকে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। অনেকে বংশগৌরব বা অভিজাত্যের বড়াই করে। তাদের ধারণা কোন বিখ্যাতি বড় বংশে জন্মগ্রহণ করলেই ভাল লোক হবে এমন ধারণা অনেকের আছে। বিত্তশালী লোকেরাও টাকার গৌরব প্রকাশ করে নিজেদের বড় মনে করে।
বংশগৌরব : অবশ্য আমাদের সমাজের মধ্যে অর্থগৌরব বা বংশমর্যাদার স্থান অনেকটা উপরে বলে মনে করার মত লোকের অভাব নেই। এর ফলে সমাজে এক শ্রেণীর অহঙ্কারী লোক অপর লোকের ওপর প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের প্রতিপত্তি বজায় রাখার চেষ্টা করে। এতে সমাজে আসে উঁচু-নিচু ভেদাভেদ, সৃষ্টি হয় অপ্রীতিকর অবস্থা।
আপনার চিন্তা একেবারেই সত্যি। মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার বংশগৌরব বা সামাজিক অবস্থান দিয়ে বিচার করা উচিত নয়, কারণ স্রষ্টা সবাইকে সমানভাবে সৃষ্টি করেছেন। সমাজে যে ব্যবধান রয়েছে, তা মানুষের নিজস্ব স্বার্থে তৈরি। এই পার্থক্যগুলো মূলত আমাদের স্বার্থে ও ভ্রান্ত ধারণায় নির্মিত, আর তা মানবতার প্রকৃত সত্তা প্রকাশ করতে বাধা সৃষ্টি করে।
সঠিক মর্যাদা নির্ধারণের জন্য আমাদের জীবনের কাজ, পরিশ্রম এবং তার ফলাফলকে মূল্যায়ন করতে হবে। বংশগৌরব বা সামাজিক শ্রেণী মানুষের সত্যিকারের পরিচয় বা মর্যাদার কোনও মাপকাঠি নয়। বরং, মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার জীবনকর্ম, সততা, সতর্কতা এবং পরিশ্রমের ফলেই পরিপূর্ণ হয়। জীবনে উন্নতির জন্য নিজের কৃতিত্ব প্রমাণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আর সেটা কোনো আভিজাত্য বা বংশগৌরবের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।
কর্মই জীবন : মানুষের জীবন কাজকর্মে মুখরিত হলেই তার বৈশিষ্ট্য জনসমাজে প্রতিফলিত হওয়া সম্ভব। এই পৃথিবীতে স্রষ্টা মানুষকে পাঠিয়েছেন একটা বিশেষ দায়িত্বের বোঝা দিয়ে। শুধু নিজের খাওয়া-পরার সাধনায় জীবন কাটাবে তা কেউ মনে করে না। বরং সংসারে স্রষ্টার নির্দেশিত পতে চলতে গিয়ে কে কতটুকু কাজে লেগেছে সেটা বিবেচনার দরকার। দেশ ও জাতির জন্য কাজ করতে পারলে সে কাজের মূল্য অনেক বেশি মনে করা হয়। যারা নিজের জন্যই কাজ করে তাদের জীবন যে সার্থক হয়েছে এমন মনে করা হয় না এবং তাদের জীবনের অবসানের সাথে সাথে মানুষও তাদের কথা ভুলে যায়। কিন্তু দেশ ও জাতির বৃহত্তর কল্যাণে যাঁরা নিজেদের কর্মময় জীবন উৎসর্গ করেন তাঁদের মহান অবদানে মানুষের বহু অপকার সাধিত হয় এবং প্রতিদানে মানুষ তাঁদের চিরদিন স্মরণ করে। কে ভাল বংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, অথবা কার জন্ম সমাজের নিচু স্তরে হয়েছিল একথা কেউ তলিয়ে দেখে না, বরং কে তার সমাজকে ও জাতিকে কতটুকু দান করতে পেরেছে সেটাই বিবেচনার বিষয়।
আভিজাত্য : অভিজাত লোক বলে নিছক আভিজাত্যের জন্য সম্মান পাবে এমন হতে পারে না, তার সম্মানের জন্য তাকে ভাল কাজের নমুনা দেখাতে হবে। মাকাল ফলে রঙের কোন গুরুত্ব নেই। কারণ তা গাব্যর হিসেবে কাজে আসে না। বইরের সৌন্দর্য আসার বলে বিবেচিত হয় যদি তার কোন গুণ না থাকে। অন্যদিকে নিজের ভাল কাজের জন্য অনেক কৃতি মানুষ সমাজে মর্যাদা পায়, মানুষ তাকে শ্রদ্ধা করে। তার বংশের কথা কেউ চিন্তাও করে না। শুধু নিজের ভালকাজের জন্য মানুষের হৃদয়ে সে সমাদর পায়।
উপসংহার : যে গাছ ফল দেয় না তার কোন আদর নেই। মানুষের জীবনেও তেমনি। কাজের ফল কি পাওয়া গেছে তা যাচাই করেই মানুষের সম্মান দেওয়া হয়। তাই মানুষের যদি সম্মান লাভের ইচ্ছা থাকে তবে তাকে ভাল কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে। মানুষের মহান কীর্তি হিসেবে সেসব কাজের ফল যুগ যুগ ধরে অপর মানুষের উপকারে আসে। কবি তাই লিখেছেন :
চন্দ্র কহে, বিশ্বে আলো দিয়েছি ছড়ায়ে,
কলঙ্ক যা আছে তাহা আছে মোর গায়ে।
আপনার এই চিন্তা সত্যিই গভীর ও প্রেরণাদায়ক। চাঁদের আলোর মত আমাদের কাজের গৌরবও মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়া উচিত, যেন তা সবার জন্য প্রেরণার উৎস হয়। মিথ্যা অহঙ্কার বা বংশগৌরবের প্রতি কোন নির্ভরশীলতা না রেখে, নিজস্ব কাজের মধ্যে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখা সত্যিকার সার্থকতা। জীবনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে কাজ করা, এবং সেই কাজের মাধ্যমেই নিজের অস্তিত্বকে অর্থপূর্ণ করে তোলা। আভিজাত্য দেখানোর চেয়ে কাজের ফলাফল ও অবদানই বেশি মূল্যবান। এতে না শুধু নিজের সম্মান অর্জন হয়, বরং অন্যদের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাও বৃদ্ধি পায়। আমাদের কাজের মাধ্যমে আমরা মানুষকে প্রেরণা দিতে পারি, তবে অহঙ্কারের মাধ্যমে তা কখনোই সম্ভব নয়।
এই রচনাটি পড়ে নিশ্চয়ই ভালো লেগেছে! আরও সুন্দর ও দরকারি রচনা পড়তে চাইলে আমাদের ওয়েবসাইট StudyTika.com ঘুরে দেখুন। সেখানে আরও অনেক রচনা রয়েছে, যা আপনাকে উপকৃত করবে!